কনের সাজে জেসিকা হেস বেদিতে এসে দাঁড়ালেন। তার পরনে বিয়ের সাদা গাউন, মাথায় অবগুণ্ঠন এবং হাতের আঙ্গুলে বিয়ের আংটি। বিয়ের মন্ত্র পড়তে তিনি এখন বিশপের মুখোমুখি। কিন্তু তার পাশে বরের সাজে কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ জেসিকা বিয়ে করছেন যীশুখ্রীস্টকে।
জেসিকা হেসের বয়স এখন ৪১। এখনো তিনি কুমারী। ক্যাথলিক চার্চের নিয়ম অনুযায়ী ঘোষণা করেছিলেন, একমাত্র ঈশ্বরের কাছেই নিজেকে বধূ হিসেবে সমর্পণ করবেন।
ক্যাথলিক চার্চে যারা এরকম শপথ নেন, তাদের শপথ অনুষ্ঠানে বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো করেই কনের পোশাক পরতে হয়। এরপর প্রতিজ্ঞা করতে হয়, আজীবন কৌমার্য রক্ষা করবেন। কারও সঙ্গে কোন ধরণের প্রেমের বা যৌন সম্পর্কে জড়াবেন না। তারা হাতের আঙ্গুলে একটি বিয়ের আংটিও পরেন।
জেসিকা হেস বলেন, তাঁকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি বিবাহিত? “আমি সাধারণ উত্তর দেই যে আমার অবস্থা চার্চের সিস্টারদের মতো, একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে আমি বাইরে থাকি।”
যারা এরকম কুমারী থাকার শপথ নেন, তাদের চার্চের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকতে হয় না বা সিস্টারদের মতো পোশাকও পরতে হয় না। তারা সমাজের আর দশজনের মতই জীবন যাপন করতে পারেন। চাকুরী করতে পারেন।
যেমন, জেসিকা একটি স্কুলে চাকুরি করছেন গত ১৮ বছর ধরে। তিনি থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের ফোর্ট ওয়েইন শহরে।
তবে কাজ শেষে বাকী সময়ের বেশিরভাগটাই তার কাটে প্রার্থনায় আর ঈশ্বরের সেবায়। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হয় একজন বিশপের সঙ্গে।

ছবির উৎস,TODAY’S CATHOLIC/JOE ROMIE
অনুষ্ঠানের শেষে কুমারীত্বের শপথ নেয়া বধুকে বেদির সামনে শুয়ে পড়তে হয়
সারাজীবনের অঙ্গীকার
জেসিকে হেসের মতো যারা সারাজীবন কুমারী থাকার অঙ্গীকার করেছেন, তাদের ব্যাপারে ক্যাথলিক চার্চের মানুষেরাও খুব কমই জানেন। কারণ মাত্র ৫০ বছরের কিছু সময় আগে ক্যাথলিক চার্চ এরকম একটি প্রথা প্রকাশ্যে অনুমোদন করে।
অথচ ক্যাথলিক চার্চে সেই বহু শত বছর আগে কুমারী থাকার চর্চা ছিল। মধ্যযুগে এই প্রথা কমে গিয়েছিল।
১৯৭১ সালে ভ্যাটিকান এরকম কুমারী থাকার প্রথাকে ধর্মীয় অনুমোদন দেয়।
২০১৩ সালে জেসিকা কুমারী থাকার শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর দুবছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘তিনি পবিত্র কুমারী’ বলে ঘোষিত হন।
ঐ অনুষ্ঠানের শেষ ধাপে তাকে গির্জার বেদির সামনে শুয়ে পড়তে হয়।
“এর মানে হচ্ছে আমি নিজেকে উপহার হিসেবে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করছি, আজীবনের জন্য তাকে গ্রহণ করছি।”
যুক্তরাষ্ট্রে জেসিকার মতো ‘পবিত্র কুমারী’ বা ‘যীশুখ্রীস্ট্রের বধূ’ আছে ২৫৪ জন। এদের কেউ হয়তো পেশায় নার্স, কেউ একাউন্ট্যান্ট, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ কাজ করেন দমকল কর্মী হিসেবে।
বিশ্বজুড়ে এরকম ‘পবিত্র কুমারী’ আছে চার হাজারের মতো। ভ্যাটিকান বলছে, অনেক জায়গাতেই এরকম শপথ নেয়া নারীর সংখ্যা বাড়ছে।

ছবির উৎস,TODAY’S CATHOLIC/JOE ROMIE
অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন জেসিকার পরিবারের সদস্যরা এবং অনেক বন্ধু-বান্ধব
জেসিকা হেস একটা বয়সে কয়েকটি রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এদের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে কোন পরিণতিতে যেতে পারে সেটা তার মনে হয়নি।
যে সমাজে যৌনতা নিয়ে অতটা সংস্কার নেই, সেখানে আজীবন কুমারী থাকার শপথ বেশ কঠিনই বটে।
“আমার মনে হয় সবচেয়ে কঠিন হচ্ছে আপনাকে মানুষ ভুল বুঝতে পারে। কারণ আমরা যে জীবন বেছে নিয়েছি, সেটাকে প্রচলিত সংস্কৃতির বিরোধী বলে গণ্য করা হয়।”
“আমাকে প্রায়ই শুনতে হয়, ও, তুমি এখনো একা? তখন আমাকে ব্যাখ্যা করতে হয়, আমার সম্পর্ক ঈশ্বরের সঙ্গে, আমি আমার শরীরও ঈশ্বরকেই দিয়েছি।”
শারীরিকভাবেও কুমারী?
গত জুলাই মাসে ভ্যাটিকান একগুচ্ছ নতুন নিয়ম-কানুন প্রকাশ করে যা ‘পবিত্র কুমারী’দের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছিল।
প্রশ্নটা ছিল, যারা ‘পবিত্র কুমারী’ হয়েছেন, তাদের কি সারাজীবন শারীরিকভাবেও কুমারী থাকতে হবে?
যারা নান বা সন্ন্যাসিনী, তাদের বেলায় নিয়ম হচ্ছে, যেদিন থেকে তারা চার্চে যোগ দিচ্ছেন, সেদিন থেকে তারা কৌমার্য রক্ষা করবেন। কিন্তু ‘পবিত্র কুমারী’দের বেলায় নিয়ম ছিল, তাদের জন্ম থেকেই কুমারী থাকতে হবে।
কিন্তু ভ্যাটিকানের নতুন নিয়মে বলা হয়েছিল, এরকম থাকতে পারলে ভালো, কিন্তু পবিত্র কুমারীদের দলে যোগ দিতে গেলে এটা একেবারে অপরিহার্য তা নয়।

ছবির উৎস,JOE ROMIE
অনুষ্ঠানে ক্যাথলিক চার্চের বিশপদের সঙ্গে জেসিকা
কিন্তু জেসিকা হেস যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্যাথলিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তারা এই নতুন নিয়মকে খুবই আপত্তিকর বলে মনে করে। তারা চিঠি লিখে এর প্রতিবাদ জানায়।
জেসিকা হেস চান, ভ্যাটিকানের দলিলে যেন বিষয়টা আরেকটি পরিষ্কার করে বলা হয়।
এরকম নিয়ম কেন করা হয়েছে, সেটা তিনি কিছুটা বুঝতে পারেন।
“অতীতে কেউ হয়তো ভুলে কিছু একটা করেছিল, বা কেউ হয়তো ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। কিন্তু নিজের ইচ্ছায় তো তারা তাদের কৌমার্য হারায়নি।”
1 comment
Hi, this is a comment.
To get started with moderating, editing, and deleting comments, please visit the Comments screen in the dashboard.
Commenter avatars come from Gravatar.